Help Poor people to Donate Here

এসো হে বৈশাখ এসো এসো

আজ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। শুরু হলো নতুন বর্ষ ১৪২০। বাঙালি জীবনে বাংলা নববর্ষের প্রভাব ব্যাপক এবং বিস্তৃত। এ প্রভাব বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসূত্রে প্রাপ্ত। বাঙালি সংস্কৃতির উৎস ও ভিত্তি অষ্ট্রীক-দ্রাবিড়-মঙ্গেলীয়-মালয়ী-ইন্দোনেশীয় ও আরব-তুর্ক উপাদান সমাজ বিজ্ঞানের ধারায় একীভূত হয়ে হাজার বছর আগে যে বৈদিক ভাবসম্পদ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, এক সময় বৌদ্ধবোধ সেই ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটালে অনতিকাল পরেই আরব-তুর্ক ভাবনার পতাকাবাহী তুর্কী আগমনের মধ্য দিয়ে আমরা পেলাম ব্যবহারিক চান্দ্রসন। তবে বাঙালি মন-মানস চান্দ্রসনের চাইতে সৌরমাসকে বরাবর অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবু বলা যায়, এই দুটি ভাবসম্পদ অবলম্বন করেই বাঙালি সমাজ রক্তবর্ণগোত্রের এক অদ্ভুত মিশেল হতে নৃতাত্তি্বক রূপের অভিভাজ্য সাংস্কৃতিক বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হয়। অনেক বিদেশি শাসন ও প্রভাব বাঙালি সংস্কৃতির অভিন্নতাকে আপাত বিচ্ছিন্ন করলেও বাঙালি তার আপন ভাষার নিশানা ধরে জাতিসত্তার অস্তিত্বকে বিকাশমান করে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বাংলা ভাষা ও বাংলার লোক-ঐতিহ্যকে মধ্যযুগের বাংলার শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক স্বীকৃতিদানের ফলে বাঙালি তার মন ও মানস থেকে বাংলা বর্ষকে মুছে ফেলতে পারেনি। বাংলার গ্রাম জীবন পুরোপুরি বাংলা বর্ষকে অনুসরণ করেছে। শহরজীবন ইংরেজি ক্যালেন্ডারের দাপটে কোনঠাসা হয়ে পড়লেও পয়লা বৈশাখ বরণ ও বৈশাখী মেলার মধ্য দিয়ে নগরসংস্কৃতির বিকাশকে সহায়তা করে চলেছে। বলা যায়, বৈশাখ থেকে শুরু করে চৈত্র পর্যন্ত সমগ্র বাংলা বর্ষ বাঙালি জীবনের সামাজিকতায়, ধার্মিকতায়, আচারে ও অনুষঙ্গে এক অভিন্ন সত্তাকে চিনিয়ে দেয়। বাংলা বর্ষ ও তার উৎসব প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন_ "প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী। কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, যে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া বৃহৎ।' এই বৃহতের দিকে যাত্রার মূলে আছে বাংলা বর্ষ। বছরের প্রথম মাস বৈশাখকে ঘিরেই রচিত হয় উৎসবের নেশা। গোটা বছর জুড়েই তার অস্তিত্ব বাঙালির চিত্তকে জাগিয়ে রাখে। কোথায় সে নেই। বাংলা ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যময় নামের মধ্যেও সে আছে, আছে বিভিন্ন মেলা, পার্বনের মধ্যে। পূজা, বিয়ে, ঈদ, বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা, কৃষকের লাঙ্গলের ফলায়, বীজ বপনে, কাটাই-মাড়াই, হিসেব-নিকেশ সর্বত্রই বাংলা সন ও মাসের ব্যবহারিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য অনিঃশেষ ও প্রভাববিস্তারী হয়ে দেখা দেয়। বাঙালি কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী ও দার্শনিকের লেখায়, শিল্পে, চিন্তায় বাংলা সন, মাস এক অপরূপ বিভায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। চর্যাপদ থেকে এই আধুনিক কাল পর্যন্ত বাংলা বছর নানাভাবে নানা প্রক্রিয়ায় তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈভবটি স্বকীয়তা নিয়ে হাজির হয়েছে। কাল বৈশাখীর প্রচন্ড দাপট, রুক্ষ রৌদ্রের দাবদাহ সত্ত্বেও আমরা নববর্ষের প্রথম দিনটিকে আবাহন করতে ভুলি না_ 'এসো হে বৈশাখ এসো এসো/তাপস নিঃশ্বাস বায়ে/মমুর্ষূরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ো যাক যাক যাক। এসো এসো।' বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল এই বাংলা বর্ষকে বাঙালি জনজীবনের চিত্তকে নানাভাবে জাগিয়ে দেন। জাতির মুমুর্ষূ প্রাণকে সতেজ করার অভিলাষে, বৎসরের আবর্জনাকে দূর করে দেওয়ার ঐকান্তিক প্রয়াসে বাংলা বর্ষকে বরণ করে নেওয়া বাঙালির সাংস্কৃতিক অভিলাষকে উচ্চ আসনে অভিষিক্ত করেছে। প্রাচ্যের প্রায় সব দেশজুড়ে বৈশাখী নামের বিরাট উৎসব আছে। ঐ বৈশাখী নামের ভিতর আছে সমস্ত প্রাচ্য জুড়ে উপমহাদেশীয় সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতির মূল অংশে আমরা বাঙালিরা জড়িয়ে আছি। বাঙালি কত সৌন্দর্য সচেতন যে বাংলা মাসের নামের মধ্যে তা ফুটে উঠেছে। সূর্য যে নক্ষত্রমন্ডলে যে মাসে থাকে, সেই মাস অনুসারে বাংলা মাসের নামকরণ করা হয়েছে। যেমন-বিশাখা থেকে বৈশাখ, জৈষ্ঠা থেকে জৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, ভদ্রা থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, পূষা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফল্গু থেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র। আমাদের জাতীয় উৎসবের উৎস নিহিত আছে জাতির অন্তরেই। উৎসবপ্রিয় মানুষের সর্বজনীন উৎসবের উৎস নিহিত আছে জাতির অন্তরেই। উৎসবপ্রিয় মানুষের সর্বজনীন উৎসবই তার সংস্কৃতির শিকড় সঞ্জীবিত করে। বাংলা বর্ষ তথা পয়লা বৈশাখ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালির সর্বজনীন উৎসবের ভিত্তি হতে পারে যা আধুনিক জাতির সাংস্কৃতির মুক্তি পথ দেখাতে পারে। বাংলা নতুন বর্ষ আসে নতুন বোধ, বিশ্বাস ও প্রজ্ঞা নিয়ে। বাঙালি জীবনে বাংলা নববর্ষের প্রভাবের ব্যাপকতা আরও যাতে বিস্তৃত হয়, গ্রাম জীবন থেকে শুরু করে শহর জীবনের প্রতিটি বাঙালির চেতনায় যাতে বাংলা বর্ষ সর্বজনীন রূপে সাংস্কৃতিক মুক্তি বয়ে আনে সে চেষ্টাই হবে বছরের প্রথম দিনের একমাত্র অভিলাষ। স্বাগত হে পয়লা বৈশাখ।

No comments

Please do not inter any spam

Powered by Blogger.